একটি সুন্দর ইসলামী নাম রাখা প্রত্যেক মুসলিম পিতা-মাতার কর্তব্য

শিশুর জন্মের পর তার জন্য একটি সুন্দর ইসলামী নাম রাখা প্রত্যেক মুসলিম পিতা-মাতার কর্তব্য। মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলিমদের ন্যায় ব...

শিশুর জন্মের পর তার জন্য একটি সুন্দর ইসলামী নাম রাখা প্রত্যেক মুসলিম পিতা-মাতার কর্তব্য। মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের মুসলিমদের ন্যায় বাংলাদেশের মুসলিমদের মাঝেও ইসলামী সংস্কৃতি ও মুসলিম ঐতিহ্যের সাথে মিল রেখে শিশুর নাম নির্বাচন করার আগ্রহ দেখা যায়। এজন্য তাঁরা নবজাতকের নাম নির্বাচনে পরিচিত আলেম-ওলামাদের শরণাপন্ন হন। তবে সত্যি কথা বলতে কী এ বিষয়ে আমাদের পড়াশুনা একেবারে অপ্রতুল। তাই ইসলামী নাম রাখার আগ্রহ থাকার পরও অজ্ঞতাবশত আমরা এমনসব নাম নির্বাচন করে ফেলি যেগুলো আদৌ ইসলামী নামের আওতাভুক্ত নয়। শব্দটি আরবি অথবা কুরআনের শব্দ হলেই নামটি ইসলামী হবে তা নয়। কুরআনে তো পৃথিবীর নিকৃষ্টতম কাফেরদের নাম উল্লেখ আছে।


ইবলিস, ফেরাউন, হামান, কারুন, আবু লাহাব ইত্যাদি নাম তো কুরআনে উল্লেখ আছে। তাই বলে কী এসব নামে নাম বা উপনাম রাখা ঠিক হবে?

ব্যক্তির নাম তার স্বভাব চরিত্রের উপর ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে বর্ণিত আছে। শাইখ বকর আবু যায়েদ বলেন, ঘটনাক্রমে দেখা যায় ব্যক্তির নামের সাথে তার স্বভাব ও বৈশিষ্ট্যের মিল থাকে। এটাই আল্লাহর তাআলার হেকমতের দাবি। যে ব্যক্তির নামের অর্থে চপলতা রয়েছে তার চরিত্রেও চপলতা পাওয়া যায়। যার নামের মধ্যে গাম্ভীর্যতা আছে তার চরিত্রে গাম্ভীর্যতা পাওয়া যায়। খারাপ নামের অধিকারী লোকের চরিত্রও খারাপ হয়ে থাকে। ভাল নামের অধিকারী ব্যক্তির চরিত্রও ভাল হয়ে থাকে।

রাসূল (সা.) কারো ভাল নাম শুনে আশাবাদী হতেন। হুদাইবিয়ার সন্ধির সময় মুসলিম ও কাফের দুপক্ষের মধ্যে টানাপোড়নের এক পর্যায়ে আলোচনার জন্য কাফেরদের প্রতিনিধি হয়ে সুহাইল ইবনে আমর নামে এক ব্যক্তি এগিয়ে এল তখন রাসূল (সা.)সুহাইল নামে আশাবাদী হয়ে বলেন- সুহাইল তোমাদের জন্য সহজ করে দিতে এসেছেন।সুহাইল শব্দটি সাহলুন (সহজ) শব্দের ক্ষুদ্রতা নির্দেশক রূপ। যার অর্থ হচ্ছে- অতিশয় সহজকারী। বিভিন্ন কবিলার ভাল অর্থবোধক নামে রাসূল (সা.)আশাবাদী হওয়ার নজির আছে। তিনি বলেছেন: গিফার (ক্ষমা করা) কবিলা তথা গোত্রের লোকদেরকে আল্লাহ ক্ষমা করে দিন। আসলাম (আত্মসমর্পণকারী/শান্তিময়)কবিলা বা গোত্রের লোকদেরকে আল্লাহ শান্তি দিন।

নিম্নে আমরা নবজাতকের নাম রাখার ক্ষেত্রে অনুসরণযোগ্য কিছু নীতিমালা তুলে ধরব:

এক: নবজাতকের নাম রাখার সময়কালের ব্যাপারে রাসূল (সা.)থেকে তিনটি বর্ণনা রয়েছে। শিশুর জন্মের পরপরই তার নাম রাখা। শিশুর জন্মের তৃতীয় দিন তার নাম রাখা। শিশুর জন্মের সপ্তম দিন তার নাম রাখা। এর থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ইসলাম এ বিষয়ে মুসলিমদেরকে অবকাশ দিয়েছে। যে কোনোটির উপর আমল করা যেতে পারে। এমনকি কুরআনে আল্লাহ তাআলা কোনো কোনো নবীর নাম তাঁদের জন্মের পূর্বে রেখেছেন মর্মে উল্লেখ আছে।

দুই: আল্লাহর নিকট সবচেয়ে উত্তম নাম হচ্ছে আব্দুল্লাহ ও আব্দুর রহমান। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে রাসূল (সা.)বলেছেন - إِنَّ أَحَبَّ أَسْمَائِكُمْ إِلَى اللَّهِ عَبْدُ اللَّهِ وَعَبْدُ الرَّحْمَنِ অর্থ-তোমাদের নামসমূহের মধ্যে আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় হচ্ছে- আব্দুল্লাহ (আল্লাহর বান্দা) ও আব্দুর রহমান (রহমানের বান্দা)।এ নাম দুটি আল্লাহর প্রিয় হওয়ার কারণ হল- নাম দুটিতে আল্লাহর দাসত্বের স্বীকৃতি রয়েছে। তাছাড়া আল্লাহর সবচেয়ে সুন্দর দুটি নাম এ নামদ্বয়ের সাথে সম্বন্ধিত আছে। একই কারণে আল্লাহর অন্যান্য নামের সাথে আরবী আবদ (বান্দা বা দাস) শব্দটিকে সমন্ধিত করে নাম রাখাও উত্তম।

তিন: যে কোনো নবীর নামে নাম রাখা ভাল। যেহেতু তাঁরা আল্লাহর মনোনীত বান্দা। হাদিসে এসেছে নবী (সা.)বলেছেন- তোমরা আমার নামে নাম রাখ। আমার কুনিয়াতে (উপনামে) কুনিয়ত রেখো না। নবী (সা.)এর কুনিয়ত ছিল- আবুল কাসেম। নবী করীম (সা.)তাঁর নিজের সন্তানের নাম রেখেছিলেন ইব্রাহিম। কুরআনে কারীমে ২৫ জন নবী-রাসূলের নাম বর্ণিত আছে মর্মে আলেমগণ উল্লেখ করেছেন। এর থেকে পছন্দমত যে কোনো নাম নবজাতকের জন্য নির্বাচন করা যেতে পারে।

চার: নেককার ব্যক্তিদের নামে নাম রাখাও উত্তম। এর ফলে সংশ্লিষ্ট নামের অধিকারী ব্যক্তির স্বভাবচরিত্র নবজাতকের মাঝে প্রভাব ফেলার ব্যাপারে আশাবাদী হওয়া যায়। এ ধরনের আশাবাদ ইসলামে বৈধ। এটাকে তাফাউল (تَفَاؤُلٌ) বলা হয়। নেককার ব্যক্তিদের শীর্ষস্থানে রয়েছেন রাসূল (সা.)এর সাহাবায়ে কেরাম। তারপর তাবেয়িন। তারপর তাবে-তাবেয়িন। এরপর আলেম সমাজ।

পাঁচ: আমাদের দেশে শিশুর জন্মের পর নাম রাখা নিয়ে আত্মীয় স্বজনদের মধ্যে একটা প্রতিযোগিতা দেখা যায়। দাদা এক নাম রাখলে নানা অন্য একটা নাম পছন্দ করেন। বাবা-মা শিশুকে এক নামে ডাকে। খালারা বা ফুফুরা আবার ভিন্ন নামে ডাকে। এভাবে একটা বিড়ম্বনা প্রায়শঃ দেখা যায়। এ ব্যাপারে শাইখ বাকর আবু যায়দ বলেন, নাম রাখা নিয়ে পিতা-মাতার মাঝে বিরোধ দেখা দিলে শিশুর পিতাই নাম রাখার ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাবেন। তোমরা তাদেরকে তাদের পিতৃপরিচয়ে ডাক। এটাই আল্লাহর কাছে ন্যায়সঙ্গত।[সূরা আহযাব ৩৩:৫]

শিশুর পিতার অনুমোদন সাপেক্ষে আত্মীয়স্বজন বা অপর কোনো ব্যক্তি শিশুর নাম রাখতে পারেন। তবে যে নামটি শিশুর জন্য পছন্দ করা হয় সে নামে শিশুকে ডাকা উচিত। আর বিরোধ দেখা দিলে পিতাই পাবেন অগ্রাধিকার।

ছয়: কোনো ব্যক্তির প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য তাকে তার সন্তানের নাম দিয়ে গঠিত কুনিয়ত বা উপনামে ডাকা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে বড় সন্তানের নামের পূর্বে আবু বা পিতা শব্দটি সম্বন্ধিত করে কুনিয়ত রাখা উত্তম। যেমন- কারো বড় ছেলের নাম যদি হয় উমর তার কুনিয়ত হবে আবু উমর (উমরের পিতা)। এক্ষেত্রে বড় সন্তানের নাম নির্বাচন করার উদাহরণ রাসূল (সা.) এর আমল থেকে পাওয়া যায়। এক সাহাবীর কুনিয়াত ছিল আবুল হাকাম। যেহেতু হাকাম আল্লাহর খাস নাম তাই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তা পরিবর্তন করে দিলেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন: তোমার ছেলে নেই? সাহাবী বললেন, শুরাইহ, মুসলিম ও আব্দুল্লাহ। তিনি বললেন: এদের মধ্যে বড় কে? সাহাবী বললেন: শুরাইহ। তখন রাসূল (সা.)বললেন- তোমার নাম হবে: আবু শুরাইহ।

সাত: যদি কারো নাম ইসলামসম্মত না হয়; বরঞ্চ ইসলামী শরিয়তে নিষিদ্ধ এমন নাম হয় তাহলে এমন নাম পরিবর্তন করা উচিত। যেমন- ইতিপূর্বে উল্লেখিত হাদিস হতে আমরা জানতে পেরেছি একজন সাহাবীর সাথে ‘হাকাম’ শব্দটি সংশ্লিষ্ট হয়েছিল, কিন্তু হাকাম আল্লাহর খাস নামসমূহের একটি; তাই রাসূল (সা.) তা পরিবর্তন করে দিয়ে তাঁর নাম রেখেছেন আবু শুরাইহ।

মহিলা সাহাবী যয়নব (রা.)এর নাম ছিল বার্‌রা (بَرَّةٌ -পূর্ণবতী)। তা শুনে রাসূল (সা.)তাঁকে বললেন তুমি কি আত্মস্তুতি করছ? তখন রাসূল (সা.)তাঁর নামও পরিবর্তন করে ‘যয়নব’ রাখলেন।

আট: সাম্প্রতিককালে আমাদের দেশে বাংলা শব্দে নাম রাখার প্রবণতা দেখা যায়। ইসলামী নীতিমালা লঙ্ঘিত না হলে এবং এতদঅঞ্চলের মুসলিমদের ঐতিহ্যের সাথে সাংঘর্ষিক না হলে এমন নাম রাখাতে দোষের কিছু নেই।‘আল-মাউসুআ আলফিকহিয়া কুয়েতিয়া’ তথা কুয়েতস্থ ফিকহ বিষয়ক বিশ্বকোষ গ্রন্থে বলা হয়েছে- নাম রাখার মূলনীতি হচ্ছে- নবজাতকের যে কোনো নাম রাখা জায়েয; যদি না শরিয়তে এ বিষয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা না থাকে। কিন্তু অনন্ত, চিরঞ্জীব, মৃত্যুঞ্জয় এ অর্থবোধক নাম কোনো ভাষাতেই রাখা কোনো অবস্থায় জায়েয নয়। কারণ নশ্বর সৃষ্টিকে অবিনশ্বর সৃষ্টিকর্তা আল্লাহর গুণাবলীতে ভূষিত করা জায়েয নেই।

ইসলামে যেসব নাম রাখা হারাম

এক: আল্লাহর নাম নয় এমন কোনো নামের সাথে গোলাম বা আব্দ (বান্দা) শব্দটিকে সম্বন্ধ করে নাম রাখা হারাম। যেমন- আব্দুল ওজ্জা (ওজ্জার উপাসক), আব্দুশ শামস (সূর্যের উপাসক), আব্দুল কামার (চন্দ্রের উপাসক),আব্দুল কালাম (কথার দাস), আব্দুল কাবা (কাবাগৃহের দাস), আব্দুন নবী (নবীর দাস), গোলাম নবী (নবীর দাস), আব্দুস শামছ (সূর্যের দাস), আব্দুল কামার (চন্দ্রের দাস), আব্দুল আলী (আলীর দাস), আব্দুল হুসাইন (হোসাইনের দাস), আব্দুল আমীর (গর্ভনরের দাস), গোলাম মুহাম্মদ (মুহাম্মদের দাস), গোলাম আবদুল কাদের (আবদুল কাদেরের দাস)ইত্যাদি। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে দেখা যায় নামের মধ্যে আব্দ শব্দটা থাকলেও ডাকার সময় আব্দ শব্দটা ছাড়া ব্যক্তিকে ডাকা হয়। যেমন আব্দুর রহমানকে ডাকা হয় রহমান বলে। আব্দুর রহীমকে ডাকা হয় রহীম বলে। এটি অনুচিত। আর যদি দ্বৈত শব্দে গঠিত নাম ডাকা ভাষাভাষীদের কাছে কষ্টকর ঠেকে সেক্ষেত্রে অন্য নাম নির্বাচন করাটাই শ্রেয়। এমনকি অনেক সময় আল্লাহর নামকে বিকৃত করে ডাকার প্রবণতাও দেখা যায়। এ বিকৃতির উদ্দেশ্য যদি হয় আল্লাহকে হেয় করা তাহলে ব্যক্তির ঈমান থাকবে না। আর এই উদ্দেশ্য না থাকলেও এটি করা অনুচিত।

দুই: অনুরূপভাবে যেসব নামকে কেউ কেউ আল্লাহর নাম মনে করে ভুল করেন অথচ সেগুলো আল্লাহর নাম নয় সেসব নামের সাথে আব্দ বা দাস শব্দকে সম্বন্ধিত করে নাম রাখাও হারাম। যেমন- আব্দুল মাবুদ (মাবুদ শব্দটি আল্লহর নাম হিসেবে কুরআন ও হাদীছে আসেনি; বরং আল্লাহর বিশেষণ হিসেবে এসেছে), আব্দুল মাওজুদ (মাওজুদ শব্দটি আল্লাহর নাম হিসেবে কুরআন ও হাদীছে আসেনি)।
তিন: মানুষ যে উপাধির উপযুক্ত নয় অথবা যে নামের মধ্যে মিথ্যাচার রয়েছে অথবা অসার দাবী রয়েছে এমন নাম রাখা হারাম। যেমন- শাহেনশাহ (জগতের বাদশাহ) বা মালিকুল মুলক (রাজাধিরাজ) নাম বা উপাধি হিসেবে নির্বাচন করা। সাইয়্যেদুন নাস (মানবজাতির নেতা) নাম রাখা। একই অর্থবোধক হওয়ার কারণে মহারাজ নাম রাখাকেও হারাম বলা হয়েছে।

চার: যে নামগুলো আল্লাহর জন্য খাস সেসব নামে কোন মাখলুকের নাম রাখা বা কুনিয়ত রাখা হারাম। যেমন- আল্লাহ, আর-রহমান, আল-হাকাম, আল-খালেক ইত্যাদি। তাই এসব নামে কোন মানুষের নাম রাখা সমীচীন নয়। পক্ষান্তরে আল্লাহর নামসমূহের মধ্যে যেগুলো শুধু আল্লাহর জন্য খাস নয়; বরং সেগুলো আল্লাহর নাম হিসেবেও কুরআন হাদিসে এসেছে এবং মাখলুকের নাম হিসেবেও এসেছে সেসব নাম দিয়ে মাখলুকের নাম রাখা যেতে পারে।

কুরআনে এসেছে- قَالَتِ امْرَأَةُ الْعَزِيزِ অর্থ- আল আযিযের স্ত্রী বলেছেন[সূরা ইউসুফ, আয়াত: ৫১]।

যেসব নাম রাখা মাকরুহ

এক: এমন শব্দে দিয়ে নাম রাখা যার অনুপস্থিতিকে মানুষ কুলক্ষণ মনে করে। যেমন- কারো নাম যদি হয় রাবাহ (লাভবান)। কেউ যদি রাবাহকে ডাকে, আর রাবাহ বাড়িতে না থাকে তখন বাড়ির লোকদেরকে বলতে হবে রাবাহ বাড়িতে নেই। এ ধরনের বলাকে সাধারণ মানুষ কুলক্ষণ মনে করে। অনুরূপভাবে আফলাহ (সফলকাম), নাজাহ (সফলতা) ইত্যাদির নামের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। নবী (সা.) এই ধরনের নাম রাখতে নিষেধ করেছেন। পরবর্তীতে নিষেধ না করে চুপ থেকেছেন।

দুই: যেসব নামের মধ্যে আত্মস্তুতি আছে সেসব নাম রাখা মাকরুহ। যেমন, মুবারক (বরকতময়) যেন সে ব্যক্তি নিজে দাবি করছেন যে তিনি বরকতময়, হতে পারে প্রকৃত অবস্থা সম্পূর্ণ উল্টো। অনুরূপভাবে রাসূল (সা.)এক মহিলা সাহাবীর নাম বার্‌রা (পূন্যবতী) থেকে পরিবর্তন করে তার নাম দেন যয়নব। এবং বলেন: তোমরা আত্মস্তুতি করো না। আল্লাহই জানেন কে পূন্যবান।

তিন: দাম্ভিক ও অহংকারী শাসকদের নামে নাম রাখা। যেমন- ফেরাউন, হামান, কারুন, ওয়ালিদ। শয়তানের নামে নাম রাখা। যেমন- ইবলিস, ওয়ালহান, আজদা, খিনজিব, হাব্বাব ইত্যাদি।

চার: যে সকল নামের অর্থ মন্দ। মানুষের স্বাভাবিক রুচিবোধ যেসব শব্দকে নাম হিসেবে ঘৃণা করে; ভদ্রতা ও শালীনতার পরিপন্থী কোন শব্দকে নাম বা কুনিয়ত হিসেবে গ্রহণ করা। যেমন, কালব (কুকুর) মুররা (তিক্ত) হারব (যুদ্ধ)।

পাঁচ: একদল আলেম কুরআন শরীফের মধ্যে আগত অস্পষ্ট শব্দগুলোর নামে নাম রাখাকে অপছন্দ করেছেন। যেমন- ত্বহা, ইয়াসীন, হামীম ইত্যাদি।

ছয়: অনুরূপভাবে আল্লাহর সাথে আব্দ (দাস) শব্দ বাদে অন্য কোন শব্দকে সম্বন্ধিত করা। যেমন- রহমত উল্ল্যাহ (আল্লাহর রহমত)। শায়খ বকর আবু যায়দের মতে রাসূল শব্দের সাথে কোন শব্দকে সম্বন্ধিত করে নাম রাখাও মাকরূহ। যেমন- গোলাম রাসূল (গোলাম শব্দটিকে যদি আরবী শব্দ হিসেবে ধরা হয় এর অর্থ হবে রাসূলের চাকর বা বাছা তখন এটি মাকরূহ। আর যেসব ভাষায় গোলাম শব্দটি দাস অর্থে ব্যবহৃত হয় সেসব ভাষার শব্দ হিসেবে নাম রাখা হয় তখন এ ধরনের নাম রাখা হারাম যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে।)

আল্লাহর নামের সাথে আব্দ শব্দ সম্বধিত করে কিছু নির্বাচিত নাম:

আব্দুল আযীয (عَبْدُ الْعَزِيْزِ- পরাক্রমশালীর বান্দা), আব্দুল মালিক (عَبْدُ الْمَالِكِ-মালিকের বান্দা), আব্দুল কারীম (عَبْدُ الْكَرِيْمِ-সম্মানিতের বান্দা), আব্দুর রহীম (عَبْدُ الرَّحِيْمِ-করুণাময়ের বান্দা), আব্দুল আহাদ (عَبْدُ الْأَحَدِ- একক সত্তার বান্দা), আব্দুস সামাদ (عَبْدُ الصَّمَدِ- পূর্ণাঙ্গ কর্তৃত্বের অধিকারীর বান্দা), আব্দুল ওয়াহেদ (عَبْدُ الْوَاحِدِ-একক সত্তার বান্দা), আব্দুল কাইয়্যুম (عَبْدُ الْقَيُّوْمِ-অবিনশ্বরের বান্দা), আব্দুস সামী (عَبْدُ السَّمِيْعِ-সর্বশ্রোতার বান্দা), আব্দুল হাইয়্য (عَبْدُ الْحَيِّ-চিরঞ্জীবের বান্দা), আব্দুল খালেক (عَبْدُ الْخَالِقِ-সৃষ্টিকর্তার বান্দা), আব্দুল বারী (عَبْدُ الْبَارِيْ-স্রষ্টার বান্দা), আব্দুল মাজীদ (عَبْدُ الْمَجِيْدِ-মহিমান্বিত সত্তার বান্দা) ইত্যাদি।

নবী ও রাসূলগণের নাম

সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হচ্ছেন আমাদের নবী মুহাম্মদ (مُحَمَّدٌ); তাঁর অন্য একটি নাম হচ্ছে- আহমাদ (أَحْمَدُ)। শ্রেষ্ঠতম পাঁচজন রাসূলের নাম হচ্ছে- নূহ (نُوْحٌ), ইব্রাহীম (إبْرَاهِيْمُ), মুসা (مُوْسَى), ঈসা (عِيْسَى) ও মুহাম্মদ (مُحَمَّدٌ)। এগুলো ছাড়াও কুরআনে কারীমে আরো কিছু নবী ও রাসূলের নাম এসেছে সেগুলো হচ্ছে- হুদ (هُوْدٌ), সালেহ (صَالِحٌ), শুআইব (شُعَيْبٌ), দাউদ (دَاوُدُ), ইউনুস (يُوْنُسُ), ইয়াকুব (يَعْقُوْبٌ), ইউসুফ (يُوْسُفُ), ইসহাক (اِسْحَاقٌ), আইয়ুব (أَيُّوْبُ), যাকারিয়া (زَكَرِيَّا), লূত (لُوْطٌ), হারুন (هَارُوْنٌ), ইসমাঈল (اِسْمَاعِيْلُ), ইয়াহইয়া (يَحْيى), যুল-কিফেল (ذُو الْكِفْلِ), আল-ইসাআ (اَلْيَسَع), আদম (آدم) ও একজন নেককার বাদশাহ হিসেবে ‘যুলকারনাইন’ (ذُو الْقَرْنَيْنِ) ইত্যাদি।

নির্বাচিত কিছু পুরুষ সাহাবীর নাম

সাহাবীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন- চারজন খলিফা। মর্যাদা অনুযায়ী তাঁদের সুপরিচিত নাম বা উপনাম হচ্ছে- আবু বকর (أَبُوْ بَكْر), উমর (عُمَرُ), উসমান (عُثْمَانُ), আলী (عَلِيٌّ)। এর পরের মর্যাদায় রয়েছেন জান্নাতের সুসংবাদপ্রাপ্ত বাকী ৬ জন সাহাবী। তাঁদের নাম হচ্ছে- আব্দুর রহমান (عبد الرحمن), যুবাইর (الزبير), তালহা (طَلْحَةُ), সাদ (سَعْدٌ), আবু উবাইদা (أَبُوْ عُبَيْدَةُ), সাঈদ (سَعِيْدٌ)। এরপর মর্যদাবান হচ্ছেন- বদরের যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবীগণ। বিশিষ্ট সাহাবী যুবাইর ইবনুল আওয়াম রাদিয়াল্লাহু আনহ তার ৯ জন ছেলের নাম রেখেছিলেন বদরের যুদ্ধে শহীদ হওয়া ৯ জন সাহাবীর নামে। তাঁরা হলেন- আব্দুল্লাহ (عَبْدُ الله), মুনযির (مُنْذِرٌ), উরওয়া (عُرْوَةُ), হামযা (حَمْزَةُ), জাফর (جَعْفَرٌ), মুস‘আব (مُصْعَبٌ), উবাইদা (عُبَيْدَةُ), খালেদ (خَالِدٌ), উমর (عُمَرُ)।

মেয়ে শিশুর আরো কিছু সুন্দর নাম

রাসূল (সা.)এর স্ত্রীবর্গ তথা উম্মেহাতুল মুমিনীন এর নাম: খাদিজা (خَدِيْجَةُ), সাওদা (سَوْدَةُ), আয়েশা (عَائِشَةُ), হাফসা (حَفْصَةُ), যয়নব (زَيْنَبُ), উম্মে সালামা (أُمِّ سَلَمَة), উম্মে হাবিবা (أُمِّ حَبِيْبَة), জুওয়াইরিয়া (جُوَيْرِيَةُ), সাফিয়্যা (صَفِيَّةُ)।

রাসূল (সা.)এর কন্যাদের নাম: ফাতেমা (فَاطِمَةُ), রোকেয়া (رُقَيَّةُ), উম্মে কুলসুম (أُمُّ كلْثُوْم)। আরো কিছু নেককার নারীর নাম- সারা (سَارَة), হাজেরা (هَاجِر), মরিয়ম (مَرْيَم)।

মহিলা সাহাবীদের নাম- রুফাইদা (رُفَيْدَةُ -সামান্য দান), আমেনা (آمِنَةُ -প্রশান্ত আত্মা), আসমা (أَسْمَاءُ -নাম), রাকিকা (رَقِيْقَةٌ-কোমলবতী), নাফিসা (نَفِيْسَةُ-মূল্যবান), উমামা (أُمَامَةُ- তিনশত উট), লায়লা (لَيْلى -মদ), ফারিআ (فَرِيْعَةُ -লম্বাদেহী), আতিকা (عَاتِكَةُ -সুগন্ধিনী), হুযাফা (حُذَافَةُ-সামান্য বস্তু), সুমাইয়্যা (سُمَيَّةُ -আলামত), খাওলা (خَوْلَةُ-সুন্দরী), হালিমা (حَلِيْمَةُ -ধৈর্য্যশীলা), উম্মে মাবাদ (أم مَعْبَد-মাবাদের মা), উম্মে আইমান (أمَّ أَيْمَن-আইমানের মা), রাবাব ( رَبَاب-শুভ্র মেঘ), আসিয়া (آسِيَةُ-সমবেদনা প্রকাশকারিনী), আরওয়া (أرْوَى -কোমল ও হালকা), আনিসা (أنِيْسَةُ -ভাল মনের অধিকারিনী), জামিলা (جَمِيْلَةُ-সুন্দরী), দুর্‌রা (دُرَّة-বড় মতি), রাইহানা (رَيْحَانَة-সুগন্ধি তরু), সালমা (سَلْمى-নিরাপদ), সুআদ (سُعَاد-সৌভাগ্যবতী), লুবাবা (لُبَابَة-সর্বোত্তম), আলিয়া (عَلِيَّةُ-উচ্চমর্যাদা সম্পন্না), কারিমা (كَرِيْمَةُ-উচ্চবংশী)।

মেয়েদের আরো কিছু সুন্দর নাম- ছাফিয়্যা (صَفِيَّةُ), খাওলা (خَوْلَةُ), হাসনা (حَسْنَاء-সুন্দরী), সুরাইয়া (الثُّرَيا-বিশেষ একটি নক্ষত্র), হামিদা (حَمِيْدَةُ-প্রশংসিত), দারদা (دَرْدَاءُ), রামলা (رَمْلَةُ- বালিময় ভূমি), মাশকুরা (مَشْكُوْرَةٌ-কৃতজ্ঞতাপ্রাপ্ত), আফরা (عَفْرَاءُ-ফর্সা)।

ছেলে শিশুর আরো কিছু সুন্দর নাম

উসামা (أسامة-সিংহ), হামদান (প্রশংসাকারী), লাবীব (لبيب-বুদ্ধিমান), রাযীন (رزين-গাম্ভীর্যশীল), রাইয়্যান (ريَّان-জান্নাতের দরজা বিশেষ), মামদুহ (مَمْدُوْح-প্রশংসিত), নাবহান (نَبْهَان- খ্যাতিমান), নাবীল (نَبِيْل-শ্রেষ্ঠ), নাদীম (نَدِيْم-অন্তরঙ্গ বন্ধু), ইমাদ (عِمَاد- সুদৃঢ়স্তম্ভ), মাকহুল (مكحول-সুরমাচোখ), মাইমূন (مَيْمُوْن- সৌভাগ্যবান), তামীম (تَمِيْم-দৈহিক ও চারিত্রিকভাবে পরিপূর্ণ), হুসাম (حُسَام-ধারালো তরবারি), (بَدْرٌ-পূর্ণিমার চাঁদ), হাম্মাদ (حَمَّادٌ-অধিক প্রশংসাকারী), হামদান (حَمْدَانُ-প্রশংসাকারী), সাফওয়ান (صَفْوَانُ-স্বচ্ছ শিলা), গানেম (غَانِمٌ-গাজী, বিজয়ী), খাত্তাব (خَطَّابٌ-সুবক্তা), সাবেত (ثَابِتٌ-অবিচল), জারীর (جَرِيْرٌ- রশি), খালাফ (خَلَفٌ- বংশধর), জুনাদা (جُنَادَةُ- সাহায্যকারী), ইয়াদ (إِيَادٌ-শক্তিমান), ইয়াস (إِيَاسٌ-দান), যুবাইর (زُبَيْرٌ- বুদ্ধিমান), শাকের (شَاكِرٌ-কৃতজ্ঞ), আব্দুল মুজিব (عَبْدُ الْمُجِيْبِ- উত্তরদাতার বান্দা), আব্দুল মুমিন (عَبْدُ الْمُؤْمِنِ- নিরাপত্তাদাতার বান্দা), কুদামা (قُدَامَةُ- অগ্রণী), সুহাইব (صُهَيْبٌ-যার চুল কিছুটা লালচে) ইত্যাদি।

মন্তব্য

Name

ইসলাম,1,এক্সক্লুসিভ,1,ওয়েব ডিজাইনিং,1,গ্রাফিক্স ডিজাইন,1,টেকনোলজি,1,তথ্য-প্রজুক্তি,1,দৈনিক শিক্ষা,1,প্রোগ্রামিং,1,রহস্যময় জগত,1,
ltr
item
KakTarua: একটি সুন্দর ইসলামী নাম রাখা প্রত্যেক মুসলিম পিতা-মাতার কর্তব্য
একটি সুন্দর ইসলামী নাম রাখা প্রত্যেক মুসলিম পিতা-মাতার কর্তব্য
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEjs_qRjFCn_-O7PKtaAdPNYFTU2PKaLk0k5mQ8gmJ_u4GH79L7DYcQ9tIl_Arh8F7fbxiCC7-t3c_boqsDqcKnmkmlkrwm5jWK6eLJ9632cPw5p25rpZ3iF2PgpHffQFqM1N5RyJkP2m48/s640/maxresdefault.jpg
https://blogger.googleusercontent.com/img/b/R29vZ2xl/AVvXsEjs_qRjFCn_-O7PKtaAdPNYFTU2PKaLk0k5mQ8gmJ_u4GH79L7DYcQ9tIl_Arh8F7fbxiCC7-t3c_boqsDqcKnmkmlkrwm5jWK6eLJ9632cPw5p25rpZ3iF2PgpHffQFqM1N5RyJkP2m48/s72-c/maxresdefault.jpg
KakTarua
https://kaktaruaportal.blogspot.com/2017/05/blog-post_2.html
https://kaktaruaportal.blogspot.com/
http://kaktaruaportal.blogspot.com/
http://kaktaruaportal.blogspot.com/2017/05/blog-post_2.html
true
7553699282283105038
UTF-8
সব পোস্ট লোড কোন পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায় নি সব দেখুন আরও পড়ুন উত্তর উত্তর বাতিল করুন Delete দ্বারা হোম পেজ পোস্ট সব দেখুন আপনার জন্য প্রস্তাবিত লেবেল সংরক্ষণাগার অনুসন্ধান করুন সকল পোস্ট আপনার অনুরোধ সঙ্গে কোনো পোস্ট মিল পাওয়া যায় নি Back Home Sunday Monday Tuesday Wednesday Thursday Friday Saturday Sun Mon Tue Wed Thu Fri Sat January February March April May June July August September October November December Jan Feb Mar Apr May Jun Jul Aug Sep Oct Nov Dec just now 1 minute ago $$1$$ minutes ago 1 hour ago $$1$$ hours ago Yesterday $$1$$ days ago $$1$$ weeks ago more than 5 weeks ago Followers Follow THIS CONTENT IS PREMIUM Please share to unlock Copy All Code Select All Code All codes were copied to your clipboard Can not copy the codes / texts, please press [CTRL]+[C] (or CMD+C with Mac) to copy